শুক্রবার ১৬ অক্টোবর ২০২৬ - ১৮:৫১
ইসরায়েলের অপরাধযজ্ঞের বিরুদ্ধে ইসলামি দেশগুলোর নীরবতায় যুদ্ধের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে

ইসরায়েলের অপরাধযজ্ঞের বিরুদ্ধে ইসলামি দেশগুলোর নীরবতা দেশটিকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে, যার ফলে যুদ্ধের পরিসর গাজা থেকে লেবানন, ইরান ও ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের লাহোরের বিশিষ্ট আলেম ও জুমার খতিব সাইয়্যেদ জাওয়াদ নাকাভি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের মজলিসে বেদারি উম্মতে মুস্তাফার প্রধান ও লাহোরের আল-উরওয়াতুল উসকা মাদরাসার পরিচালক সাইয়্যেদ জাওয়াদ নাকাভি লাহোরের বাইতুল আতীক মসজিদে জুমার খুতবায় গাজায় ইসরায়েলের অপরাধযজ্ঞের প্রসঙ্গ তুলে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, গাজার নিপীড়িত মুসলমানরা সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন ইসলামি দেশগুলোর কাছে বারবার সাহায্য চেয়েছেন। কিন্তু ইসরায়েলের অপরাধযজ্ঞ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই উদাসীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গাজাকে ধ্বংসের জন্য দায়ীদের নোবেল পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাবও উঠেছে। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক।

সাইয়্যেদ জাওয়াদ নাকাভি আরও বলেন, ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইসলামি দেশগুলোর নীরবতা আগ্রাসীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। এর ফলে যুদ্ধের পরিসর গাজা থেকে লেবানন, ইরান ও ইয়েমেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এসব অঞ্চলে হামলা ও অবরোধের লক্ষ্য হলো প্রতিরোধ ফ্রন্টকে দুর্বল করা এবং শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে দেওয়া।

ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে ইয়েমেনের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইয়েমেনের একমাত্র অপরাধ হলো, দেশটি গাজা ও ফিলিস্তিনের সমর্থনে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। অথচ ইয়েমেন নিজেও বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ ও ব্যাপক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে।

বক্তব্যের অন্য অংশে পাকিস্তানে পবিত্র দুই মসজিদের নাম ব্যবহার করে জনমতকে উসকে দেওয়া এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির চেষ্টাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেন তিনি।

সাইয়্যেদ জাওয়াদ নাকভি বলেন, সুন্নি মুসলমানদের একটি বড় অংশ ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সমর্থক। তবে কিছু তাকফিরি ও নাসেবি গোষ্ঠী এবং নিষিদ্ধ সংগঠন সুন্নি পরিচয়কে নিজেদের বিদ্বেষপূর্ণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, ইয়েমেন ও ইরানে চলমান যুদ্ধ একসময় শেষ হবে। কিন্তু পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক বিভেদের আগুন জ্বলে উঠলে তার পরিণতি আফগানিস্তানের যুদ্ধের মতো হতে পারে, যার প্রভাব কয়েক দশক ধরে দেশটিকে ভোগ করতে হতে পারে।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটি বর্তমানে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় নিরাপত্তাহীনতা ও সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক সংকট, অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা এবং ‘ফিতনাতুল খাওয়ারিজ’ নামে পরিচিত গোষ্ঠীগুলোর হুমকির মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধান ও দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে পবিত্র দুই মসজিদের নাম ব্যবহার করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, জনসাধারণের আবেগকে উসকে না দিয়ে সংবেদনশীল আঞ্চলিক বিষয়গুলো কূটনীতি, আনুষ্ঠানিক চিঠিপত্র ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সম্পর্ক প্রসঙ্গে সাইয়্যেদ জাওয়াদ নাকাভি বলেন, সৌদি আরবকে প্রকৃত অর্থে সমর্থন করার অর্থ ইয়েমেনের ওপর আরও হামলার পক্ষে দাঁড়ানো নয়। বরং দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়ন, হামলা বন্ধ এবং ইয়েমেনের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই হবে প্রকৃত সমর্থন। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য পাকিস্তানকে বিদেশি চাপের মুখে নিজের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় রেখে দেশটির আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করা উচিত। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার পাশাপাশি নিপীড়িত জনগণের পক্ষেও দাঁড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতীয় সংহতি বজায় রাখা, সাম্প্রদায়িক উসকানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে মতবিরোধের নিষ্পত্তি করা পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha